বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

আসুন, একটা পৃথিবী বানাই...

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা দারুণ ছোটগল্প পড়েছিলাম একবার। গল্পটা ছিলো ভবিষ্যতের। আগামীর পৃথিবীর খোলনলচে হয়ে পড়েছিলো একদম আলাদা। সেখানে ছিলো কেবল বিজ্ঞান আর বিজ্ঞান। সকলে বিজ্ঞান শিখছিলো, বিকিকিনি করছিলো- বেঁচে ছিলোনা অন্য কোন পেশার লোক। ...নাহ, ভুল বললাম, বেঁচে ছিলো এক পাগল। লালপাহাড়ে বসে পাগলা জগাই কেবল ছড়া লিখে যেতো- পাথরে,রাস্তায়,গাছের বাকলে। শহর থেকে বিজ্ঞান স্কুলের ছেলেরা যায় লালপাহাড়ে। পাগলা জগাইকে অহেতুক 'ওই আমাদের তালগাছ,ওই আমাদের গাঁ' লিখতে দেখে অবাক হয় তারা। পাগলা জানায়,"আমি বাপু পাগল, তোমাদের মত কবিতার লাভ লোকসান হিসাব করিনে।" লালপাহাড় হতে বিজ্ঞান স্কুলের ছেলেরা ঘরে ফেরে গভীর চিন্তা নিয়ে। সে চিন্তার ফসল হয়ে সপ্তাহ পরেই এক ছোঁড়া লিখে ফেলে, 'আমরা যদি না জাগি মা,কেমনে সকাল হবে ?? তোমার ছেলে উঠলে মা গো- রাত পোহাবে তবে।'এক লহমায় বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যায় কবিতা লেখার রোগ। জাতীয় কবিতা আসর উপলক্ষে আকাশ হতে বিলানো হয় কবিতা। সে কবিতা হাতে নিয়ে লালপাহাড়ে পাগলা জগাই হাসে, বলে- "যাহ, পৃথিবীটা আরেকবার বেঁচে গেলো...!!"


আজকাল আমায় খুব নেশা ধরেছে, একটা পাগলা জগাই খুঁজে নেই। ...একটা নতুন পৃথিবী বানাতে বড় বেশি ইচ্ছে করছে। যে পৃথিবীতে থাকবে কেবল পান্তাবুড়ি,সিন্ডারেলা আর টিনটিনেরা; থাকবে কেবল 'ইটি'ছবির ড্রিউ ব্যারিমুর অথবা 'দ্য ফল'ছবির কাটিঙ্কা উনতারুর মত গোলাকার নাদুশ-নুদুশ বাচ্চারা, থাকবে কেবল সুকুমার রায়ের 'ননসেন্স ক্লাব'- থাকবে না কোন রাজনীতি।

আজকাল খুব হতাশ হয়ে পড়ছি। তারিকের স্পেন বিজয় অথবা সিংহ-হৃদয় রাজা রিচার্ডের সাথে দুধসাদা ঘোড়ায় সওয়ার সুলতান সালাদিনের মহত্বের কাহিনী শুনে নিজের ধর্ম নিয়ে দারুণ গর্ব হতো। আজকাল আমাদের পৃথিবীতে দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমাগত বোমা হামলা আর আটবছর বয়েসে জঙ্গী হিসেবে ধৃত ব্রেইনওয়াশড ইসমাইলদের দেখে ইমিগ্রেশনে ঢুঁকবার আগে গলাটা শুকিয়ে আসে, পরিচয় দিতে গিয়ে বলি-"আমি মু...মুসলিম।" নাহ, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ আর থিউডোর হার্জল সাহেবরা তো ভালো ক্যাঁচাল লাগায়ে গেলেন। কোন ঈশ্বর আসল ?? তগোডা না আমাগোডা ?? হার্জল সাব আবার বইলা দেন, 'The idea I have developed .....is ancient one: It is the restoration of Jews state. The decessive actor is our propelling force'। ....একটা নতুন পৃথিবী বানাতে বড় বেশি ইচ্ছে করছে।সেখানে এদের সকলকে চাঁটি মেরে তাজমহলের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলতাম,"এবার মানুষের মাঝে ঈশ্বরকে খুঁজ়তে শেখ,না পারলে টলস্টয়ের ছোট গল্প পড়ে শিখেনে..."

একটা নতুন পৃথিবী বানাতে বড় বেশি ইচ্ছে করছে। যেখানে 'তারে জামিন পার' ছবির সেই ড্রইং টিচারটা হয়ে রঙ মেখে সং সেজে এক দল বাচ্চাকে নিয়ে আরামসে 'বাম বাম বোলে' বলে নাচতে পারবো, তাদের রাঙ্গাতে পারবো। আমার পৃথিবীতেও আমি টিচার বটে। আগামসি লেনের অন্ধকারাছন্ন কোন রিডিংরুমে বসে কাউকে আমি ম্যাকলরিনের সিরিজ শেখাই, আর স্বপ্ন দেখি- এমাসের বেতনটা পেয়েই মাণিক রচনাবলী ঘরে তুলবো।

একটা নতুন পৃথিবী বানাতে বড় বেশি ইচ্ছে করছে।আশা রাখি নতুন পৃথিবীতে কাউকে খুব গভীরভাবে ভালোবাসতে পারবো, মাধবীলতার মত; খুব করে ভালোবাসা পাবো,অনিমেষের মত। আমার পৃথিবীতে ভালোবাসা বড়ই সহজলভ্য। এ প্রজন্মের মাধবীলতারা একেকজন জন্মসূত্রে অড্রে হেপবার্ণ- হতাশাগ্রস্ত তরুণদের পশ্চাতদেশে বাঁশ মারতে তাদের খুব আগ্রহ। অনিমেষেরাও কম যান না, একেকজন এলকেমিস্ট- কিছু হলেই এসিড ছুঁড়বেন। এমন একটা পৃথিবী বানাই আসেন- যেখানে গভীর রাতে ঘুম থেকে পাশে শুয়ে থাকা সঙ্গীকে নীরবে 'ভালোবাসি' বলা যাবে,নির্জন লেকহাউসে কাউকে সাথে নিয়ে শোনা যাবে জন ডেনভার, হাতে হাত রেখে একত্রে দেখা যাবে 'রোমান হলিডে'।

একটা নতুন পৃথিবী বানাতে বড় বেশি ইচ্ছে করছে। যেখানে কেবল পড়বো। বোদলেয়ারের কবিতা, মোপাঁসার ছোটগল্প, গান্ধীর জীবনী। আমার পৃথিবীতে বড় বেশী পড়াশোনা- ট্রান্সফর্মার,ফুরিয়ার সিরিজ, স্ট্রেংথ অফ ম্যাটেরিয়াল- আরো বালছাল সব। স্যার- একটু শোনেন । আপনার এপ্রনটা ছুঁড়ে ফেলে আমার সাথে আসুন না একটু লরা ইঙ্গলস ওয়াইল্ডারের সেই প্রেইরিতে। আসেন, বদ্ধ ডিপার্টমেন্টাল লাইব্রেরীর টিউব বাতি ছেঁড়ে আমার সাথে বাইরে আসেন। ঈশ্বরের সাথে দেখা হলে আমার সাথে বলবেন-
"সাবাস ওস্তাদ,
কী কল বানিয়ে দিলে,
ফিলিপস,অসরামের চেয়ে ঢের ভালো
এখনো তোমার সুর্য, এত লক্ষ বছরেও
ফিউজ হলো না। "

খুব ইচ্ছা করছে,'দ্য ম্যান ফ্রম সেন্ট পিটার্সবার্গের'নায়কের মত একটা পিস্তল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। জয় করে নিই সবকিছু। একটা নতুন পৃথিবী বানাই- যেখানে হোসে আর্নেস্তোকে ওষুধের বাক্স ফেলে গুলির বাক্স নিয়ে চে গুয়েভারা হতে হবে না,যেখানে কোন মুক্তিযোদ্ধার জীবন কোন কমিঊনিটি ব্লগে তুলে দিতে হবে না, যেখানে কারো ফেইসবুক স্ট্যাটাস 'ইটস কম্পলিকেটেড' দেখাবে না।
নিশ্চিত, আমার নতুন পৃথিবীতে আমি একজন সিরিয়াল কিলার-ই হবো। একের পর এক সব না পাওয়াকে খুন করে চলবো। ঈশ্বরের হাতে ধরা পড়ে মৃত্যুদন্ডের আগে জ্যাক দ্য রিপারের মত বলবো ,"One day people will look back & will see, I GAVE the birth of 20'th century."


...আমার মত আরো অসংখ্যা তরুণ অবিরত এই পৃথিবীর আনাচে-কানাচে চ্যাঁচাচ্ছে,"ভাংগতে চাই, ভাংগতে চাই- প্রথা ভাংগতে চাই।" চারপাশের পৃথিবী কিছু ভাংগতে দেয় না।...আর, গড়বার সামর্থ্য আমাকে ঈশ্বর দেননি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন