বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

একটি মেকানিকাল দিবসের আত্মকাহিনী

-"শুনো ছোট ভাই,বিকাল পাঁচটায় অবশ্যই ইএমই-৫০২ এ চলে আসবা। "
ফোনে বড় ভাইদের রক্তজল করে দেয়া হুমকি শুনে গলাটা শুকায়া যায়,মুখ পানসে দেখায়। অথচ উপস্থিত আড্ডার নন-ডিপার্টমেন্টাল বন্ধুদের উদ্দেশ্যে ব্যাপক পার্ট নিয়া বলি- "আরে,আমারে ছাড়া তো আর মেকানিকাল ডে হইতে পারেনা, বোঝস না ক্যা ??"
চোখে মুখে 'আহা ! মেকানিকাল ডিপার্টমেন্টকে ধন্য করে দিচ্ছি।'এই জাতীয় একটা ভাব ফুটিয়ে তুলে অতীব আগ্রহের সাথে রিহার্সেলে যাই।
প্রতিদিন বিকেল পাঁচটার রিহার্সালে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। এককোণে মুঘল-এ-আযম, এককোণে মেকানিকাল 'ঘাতক' দল (মতান্তরে গাতক দল) আর এককোণে টকশো'র অবিরাম শো। আমরা,যারা বড়ভাইদের মতে আমড়া কাঁঠের ঢেঁকি, তারা কিছুক্ষণ এই বিপুল কর্মযজ্ঞে নিজেদের অবস্থান বোঝার বৃথা চেষ্টা করে হতাশ মনে আবারো লিফটে উঠে পড়ি। যন্ত্রকৌশল দিবস আসলে যন্ত্রণার নামান্তর মাত্র।


কিন্তু বড় ভাইরা নাছোড়বান্দা। অতএব সলিড মেকানিক্সের কী প্রয়োজন, ড্রইং ল্যাবে গিয়া আমরা কী ট্যাঁএএএএ...ট শিখুম ['ট্যাঁএএএএ...ট ' শব্দের কপিরাইট কিন্তু যন্ত্রকৌশল সংসদের। এবার প্রোগ্রামের 'শরাফত' আইটেম দ্রষ্টব্য। ], আমার সিজি 2.50 এর উপর যায়না ক্যান- এইসব প্রশ্নের সাথে আমার আরো একটি প্রশ্ন যোগ হয়। "04'ব্যাচের ভাইদের এতো তেল কোথা হতে আসে??" নাছোড়বান্দা ভাইরা ফোনে ক্রমাগত হুমকি দিতে থাকেন- তাদের দাবিকৃত মুক্তিপণ হলো একটা স্ক্রিপ্ট। প্রতিদিন যথারীতি স্ক্রিপ্ট ছাড়া রিহার্সালে যাই। আমার অধ্যবসায়ের কাছে বড় ভাইরা হার মানেন-তারা বোঝেন স্ক্রিপ্ট আমার কাছ থেকে আদায় করা তাদের মত ভদ্রলোক দিয়া হবে না। এমতাবস্থায় শান্তিচুক্তি বজায় রাখতে এক অসতর্ক মুহুর্তে আমি এক মহাবেকুবি করে বসি। প্রস্তাব দেই এবার যন্ত্রকৌশল দিবসের উপস্থাপনাটা আমি-ই করুম। যাক ! অনুষ্ঠানে নন-ডিপার্টমেন্টাল বন্ধুদের পচানিটা দুর্বল উপস্থাপনার ঘাড়ে চাপানো গেছে !! ভাইয়েরা অত্যন্ত খুশি হয়ে ওঠেন !! কিন্তু এবার সমস্যা শুরু করে নাহিয়ান। প্রোগামের তিনদিন আগে থেকে একখান টকশো'র থিম নিয়া সে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করে। ০৫ তারিখ প্রোগ্রাম- ০৩ তারিখ বিকালে কোন মতে একটা স্ক্রিপ্ট দাঁড়ায়। আগামী ৪৮ ঘন্টা সম্পূর্ণ মেকানিকাল ডে এর জন্যে নিবেদিত করে আমি শেষবারের মত ঢাকা শহর দেখতে বের হই,আমি নিশ্চিত প্রোগ্রামের পর আমি অডিটরিয়াম ছেড়ে বেরোতে পারবো না।



নিতান্ত চক্ষুলজ্জার খাতিরে ০৪ তারিখ সকাল দশটায় ঠিক রোলকলের সময় অডিতে হাজিরা দেই।ফাহিম ভাই আর পুলক ভাইয়ের যে এতোগুলো যময ভাই ছিলো-তা আগে জানতাম না। মেকানিকাল ডে উপলক্ষে তারা সবগুলোকে নিয়ে অডিতে খ্যাপ মারছেন,যেদিকে তাকাই সেদিকেই পুলক ভাই আর ফাহিম ভাই। এই অবসরে একটু আইটেমগুলার দিকে দৃষ্টিপাত করি।

'জিনি' নাটককে নাহিদ ভাই,আশরাফ ভাই ,পারিসা প্রায় দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। 'লাভগুরু' নিয়ে রোমান,দেবাশীষকে বেশ কনফিডেন্ট মনে হচ্ছে। 'শরাফত' টকশো-তে ইফতি,নাহিয়ান,জিমি বেশ ফিট করেছে ( স্ক্রিপ্ট-এর জন্যে মোস্তাকিম আর নাহিয়ানকে ব্যক্তিগত ধন্যবাদ জানাই।)। পুলক ভাই ,নীলয়, তুনা'র কল্যাণে 'মুঘল-এ-আজম' হতে যাচ্ছে সবচে হিট আইটেম (তবে 'আনারকলি' উচ্চারণে নীলয় ক্যাফেতে যতটা পারঙ্গম - তার ছিঁটেফোঁটাও রিহার্সেলে দেখা যাচ্ছে না !!)। পুঁথি আর প্যারোডি আইটেমদ্বয় তখনো নির্মাণাধীন।

মেকানিকাল ডে'র অসাধারণ গাতকদের সাথে আপনাদের আর আলাদা করে পরিচয় করানোর প্রয়োজন নেই। সজীব ভাই গাইবেন 'বদ্ধ জানালা', অনিন্দ্য গাইবে 'কাঁদবে বিস্ময়ে', প্রমা আপু গাইবেন 'ভাবে মন অকারণ', কল্লোল গাইবে 'আমি অপার হয়ে', নাবিল গাইবে 'ধূসর সময়', তৃণা গাইবে bring me to life । বিশেষ দুইটা গান হলো অভি ভাইয়ের 'এ বিদায়' আর আমাদের এহসান স্যারের 'নোঙ্গর তোল- তোল।'

এই হচ্ছে অবস্থা। সুখবর বলতে একটাই, বড় ভাইরা উপস্থাপিকা হিসেবে যুক্ত করেছেন অনুজ নওরীনকে; যে 'বুয়েটের সবচে সুন্দরী মেয়ে'[আলোচ্য উক্তিটির কপিরাইট ও কিন্তু যন্ত্রকৌশল সংসদের ! 'এঞ্জেলস এন্ড ডেমনস' নাটক দ্রষ্টব্য।]। কেনো তার উপর ভাইয়াদের এত আস্থা- তার জবাব চটপটে নওরীন যথাযথ ভাবে দিয়েছে তার কর্মদক্ষতা দিয়ে।


সারাদিন রিহার্সেল। অডিটরিয়াম সারাদিনই সরগরম। সেন্সর বোর্ডরূপী তারেক স্যার সন্ধ্যার সময় এসে দেখে গেলেন আমাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতি। রাতের খাবারের সময় এলেন রিয়াজ স্যার আর নুসায়ের স্যার। ফাহিম ভাই আর পুলক ভাই তাদের দুজনের সাথে বসে গেলেন আগামীকালের রণকৌশল নিয়ে কথা বলতে। শত্রুপক্ষ (বোলে তো, নন-ডিপার্টমেন্টাল বুয়েটিয়ানেরা) কোন পন্থা অবলম্বন করে আগাবে- তা নিয়ে তাদের বড়ই চিন্তিত বলে মনে হতে লাগলো। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালের আগে পেপ গার্দিওলার কী দশা হয়েছিলো;তা তাদের দেখে বেশ বুঝতে পারছিলাম।


...কথা না বাড়িয়ে সরাসরি চলে যাই একটি মেকানিকাল আফটারনুন বর্ণনায়। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে মাগলুব আল নূর স্যার অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষনা করার পর থেকে নিন্দুকদের 'ভূয়া' 'ভূয়া' হুংকার ছাপিয়ে 'মেকা''মেকা' ধ্বনিতে যে অডিটরিয়াম ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছিলো- তার পেছনে ছিলো একঝাঁক প্রতিভাবান ভবিষ্যত যন্ত্রপ্রকৌশলী। কখনো হাসি,কখনো গান,কখনো এঞ্জেল-ডেভিলের দুর্দান্ত উপস্থাপনা অডিটরিয়ামকে করে রেখেছিলো মন্ত্রমুগ্ধ (বলা ভালো,যন্ত্রমুগ্ধ)। মেকানিকাল ডে'এর তুলনা হতে পারে ...কেবল মেকানিকাল ডে স্বয়ং।

আইটেম কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলি ?? দুপুরে 'এঞ্জেলস আর ডেমন্স' এর সাথে ছিলো শিশুশ্রমকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। যন্ত্র নিয়ে পড়ে থেকেও আমাদের হৃদয় যে যান্ত্রিক হয়ে পড়েনি- এই চলচ্চিত্রটিরও পুর্বে তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন এহসান স্যার- আইলা বিধ্বস্ত উপকুলের সর্বহারা মানুষদের পাশে যন্ত্রকৌশল অনুষদের দাঁড়াবার ঘোষণা দিয়ে, সেইসব মানুষের জন্যে মেকানিকাল ডে উতসর্গ করে।

মূল অনুষ্ঠানে অনিন্দ্য,কল্লোল,সজীব ভাই,তৃণা,প্রমা আপু,এহসান স্যার গেয়েছেন সেইইইইই...রকম !! অভি ভাইয়ের গানটিকে কি বিশেষণ দেয়া যায়- বুঝতে পারছি না (মনে মনেই একটি বিশেষণ দিচ্ছি,"অবিশেষণযোগ্য" !!); এই গানই অনুষ্ঠানের বহুদিন মনে রাখার মত একটি উপসংহার দিয়েছে। নাটকের মধ্যে সবই হিট। মুঘল-এ-আযম (নীলয়-তুনা-পুলক ভাইয়ের ফ্যানপেজ খুলুম !), জিনি, পুঁথি অবিশেষণযোগ্য । 'লাভগুরু' আর 'শরাফত' নিয়ে কথাই বলবো না (মুখ খুলে মার খাবো নাকী ?? ০৬' ব্যাচের পোলাপান সব ট্যাঁ...ট জিনিস লেখে। বিশেষ করে শরাফত- ওইটা আবার কারা যেন লেখলো...!!)।


ধন্যবাদ শান্তনু স্যার,মিশা ম্যাডাম,রিয়াজ স্যার এবং নুসায়ের স্যারকে। ঘরের খেয়ে আপনারা সুন্দরবনের নয়,রীতিমত আমাজন বনের মোষ তাড়িয়েছেন- আমাদের মত একপাল অকর্মণ্যকে বারবার সুবুদ্ধি দিয়েছেন। অকর্মণ্য এই আমাদের মাঝে অতিকর্মণ্য পুলক ভাই,ফাহিম ভাই,জিতু ভাইকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ 04' ব্যাচ।


ভেরি ভেরি স্পেশাল থ্যাঙ্কস টু মারিয়া আপু । আপনি না থাকলে নিঃসন্দেহে মেকানিকাল ডে তার জৌলুস হারাতো। দেখেছি, তাও শিখতে কিছুই পারিনি আপু থেকে। আরেকটা ধন্যবাদ পাবে জিয়া। আমার এই বন্ধুটির নেতৃত্বে পুরো অনুষ্ঠানের মঞ্চ এবং প্রবেশপথ ছিলো অসাধারণ ভাবে সাজানো- কিন্তু যথারীতি জিয়া ছিলো মঞ্চের নেপথ্যে। 'অযান্ত্রিক' ম্যাগাজিনের অলঙ্করণ ও জিয়াই করেছে।


'অযান্ত্রিক' এর কথা না বললেই নয়। সম্পাদকমণ্ডলীকে অভিনন্দন। দারূণ একটা কাজ হয়েছে, প্রায় প্রতিটি লেখাই মনে রাখার মত। বাঁধিয়ে রাখার মত বহু ছবিই। এককথায় 'অযান্ত্রিক' রকস। ( আর এইখানেই আমার আক্ষেপ ! আমরা যারা মাঝে মাঝে টুকটাক ফেসবুকীয় নোট লিখে বেড়াই আর ইন্টারনেটে ব্লগাই- তারা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকি ছাপার অক্ষরে নিজের নাম কখন দেখবো এই ভেবে। আমাকে তাই অপেক্ষা করতে হবে আরো এক বছর !! তবে নিজেই নিজেকে শান্তনা দিচ্ছি , এতোসব চমতকার লেখার পাশে আমার মত বৈশ্য লেখকের লেখা আসলেই বেমানান হতো । )


সুদীর্ঘ এই লেখা বিরক্তির উদ্রেক করলে করার কিছু নাই। দূর্বল উপস্থাপনার উপদ্রব তো সহ্য করেইছেন,এবার দূর্বল লেখাও ক্ষমা করবেন এই আশা। মেকানিকালের লোকজন খুবই বড় মনের কী না !!


...আর নন-নন-ডিপার্টমেন্টাল বুয়েটিয়ানেরা; আরো একবার হতাশ হওয়ার আশায় বুক বাঁধুন। আমরা আসছি অচিরেই; ঠিক এক বছর পর !!!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন