সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

ডিটেকটিভ

ঠিক সন্ধ্যা ৭টা ৫৮ মিনিটে 'রেড ড্রাগন' বারের দরজা ঠেলে মোজাম্মেল হক ভেতরে প্রবেশ করে। ভেতরের হালকা নিয়ন আলোতে চোখ সইয়ে নিতে অপেক্ষা করে কয়েক সেকেন্ড, তারপর এগিয়ে যায় ডানদিকে সর্বশেষ সারির তিন নম্বর টেবিলটার দিকে। হাইনেক ব্লাউজ পরা ভদ্রমহিলাটির সামনের খালি চেয়ারে এগিয়ে গিয়ে বসে পড়ে সে।
- 'আমার নাম মোজাম্মেল হক।' একটু থেমে যোগ করে সে ,'প্রাইভেট ডিটেকটিভ।'
- 'বসুন', মহিলা বলেন, 'ড্রিংকস ??'
- 'ধন্যবাদ, স্কচ বলুন।'

ভদ্রমহিলা নিজের জন্যে শ্যাম্পেন নেন, মোজাম্মেলের জন্যে স্কচ। ভেতরের নীলাভ আলোর খেলা দেখতে দেখতে এবং বারের এককোণে বসে পিয়ানো বাজাতে থাকা অন্ধ যুবকটির প্রতি মনে সহানুভূতি জাগতে জাগতেই ওয়েটার ফিরে আসে। ভদ্রমহিলা গ্লাসে শ্যাম্পেন ঢেলে নিয়ে শুরু করেন।
- 'ডিটেকটিভ মোজাম্মেল হক, আমি মিসেস নাজমুল খন্দকার। আপনার কথা আমি শুনেছি মি.ওয়ালী বক্সের কাছ থেকে।'
ছোট্ট করে নড করে মোজাম্মেল। অপেক্ষা করে মূল বক্তব্যের জন্যে।
- 'মি.বক্স আপনার খুব প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বললেন, আপনি পারিশ্রমিকের বিনিময়ে মক্কেলের কাজ যথাযথ ভাবেই করেন- সেটা আইনের চোখে বৈধ হোক, কিংবা অবৈধ।' শেষ শব্দটা একটু জোরের সাথে আরোপ করেন মিসেস খন্দকার।
মোজাম্মেল হক আরেকবার মাথা ঝাঁকায়।
- 'আমার আপনাকে প্রয়োজন মি.হক। ঠিক সেরকম একটা কাজে, যে কাজে আপনাকে ব্যবহার করেছিলেন মি.বক্স।'
- 'মাফ করবেন, আমার যদ্দুর মনে পড়ে মি.বক্সের জন্যে তার স্ত্রীর মৃত্যু হওয়াটা খুব জরুরী হয়ে পড়েছিলো। আপনার ক্ষেত্রেও কি...'
- 'ঠিক ধরেছেন মি.হক; আমার ক্ষেত্রে আমার স্বামী।' হাতব্যাগ থেকে ছবি বের করে মিসেস খন্দকার টেবিলে রেখে এগিয়ে দেন মোজাম্মেলের দিকে। 'এই যে, আমার স্বামী,নাজমুল খন্দকার।'
মনোযোগ দিয়ে ছবিটা মিনিট খানেক দেখে মোজাম্মেল। প্রশ্ন করে,'কেন ??'
- 'প্রপার্টি।' মিসেস খন্দকার বলেন, ' প্রপার্টি। কত মূল্যের সেটা নাই বা বললাম...'
- 'কেবল প্রপার্টি ?? মিসেস খন্দকার,কিছু মনে করবেন না। আমার ধারণা হচ্ছে এতে আরো কিছু জড়িত...। ' ...
- 'ওয়েল, ইউ শুড নো মি.হক। ওয়ালী বক্স। উই আর ইন লাভ। ...নাজমুল, দ্যাট সন অফ আ বীচ, হি ইজ ইনভলভড উইথ এ কলেজ গার্ল নাউ। হি ডাজন্ট কেয়ার ফর মি। তাই আমরা-আমি আর ওয়ালী-একে অপরকে খুঁজে নিয়েছি। '
- 'সেই পুরোনো গল্প মিসেস খন্দকার,সেই পুরোনো গল্প।' মোজাম্মেল হক মাথা নাড়ে। 'এ ধরণের কাজ আমি মোটেই পছন্দ করি না। তারপরেও...তারপরেও আপনার কাজটা আমি করবো মিসেস খন্দকার। ...এবং দামটা হবে চড়া।'
- 'কত ??'
- 'পাঁচ লাখ...। এবং সময় দিতে হবে। তা ধরুন,পনেরো দিন...।হ্যাঁ, আশা রাখি পনেরো দিনের মাঝেই আপনি সুসংবাদ পাবেন।'
- 'বেশ,' মিসেস খন্দকার ব্যাগ থেকে চেক বই বের করতে থাকেন।'ওয়ালী বলেছে আপনি বেশ রিলায়েবল। আমি চেক লিখি দিচ্ছি, তবে কাজ একটু দ্রুত করবার চেষ্টা করবেন। নাজমুল আমাকে আর বিশ্বাস করে না। ইদানীং শুনতে পাচ্ছি আমাকে চোখে রাখতে সেও নাকি একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ লাগিয়েছে। ... একটু সাবধানে থাকবেন।'
- 'তাই তো বলছিলাম, মিসেস খন্দকার। এ ধরণের কাজ আমি মোটেই পছন্দ করি না। তারপরেও...তারপরেও পেশার খাতিরে করতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এ জাতীয় কাজে অপরপক্ষেরও একটা নিজস্ব প্ল্যান থাকে।'
- 'হ্যাঁ। নাজমুলের পক্ষে সব কিছুই সম্ভব। আমি জানি, আমাকে থামাতে সে যে কোন কিছুই করতে পারে। এনিওয়ে, এই নিন আপনার চেক,কাজটা দ্রুত সেরে ফেলুন।'
- 'শুভ সন্ধ্যা মিসেস খন্দকার।' চেকটা পকেটে পুরে উঠে দাঁড়ায় মোজাম্মেল হক। 'দ্রুতই সুসংবাদ পাবেন আশা করি। '

ডিটেকটিভ মোজাম্মেল হক বেরিয়ে এসে একটা সিএনজি নেয়। আজকাল এ শহরে অসুখী দম্পতির সংখ্যা বাড়ছে। এ ধরণের কাজ তাঁর মোটেই পছন্দ না। তারপরেও...তারপরেও পেশার খাতিরে করতে হয়। গত ছয়মাসে এরকম চারটে কেস তাঁর হাতে এসেছে। মি.ওয়ালী বক্সেরটা ছিলো সর্বপ্রথম। সর্বশেষটা এসেছে গতকাল রাতে। সেই মক্কেলের সাথে দেখা করতেই মোজাম্মেল হক এখন চলেছে হোটেল লন্ডনে-রুম নাম্বার ৪০৩৪ । মক্কেলের কাছ থেকে কিছু অগ্রীম সে গতরাতেই পেয়েছে। এবার বাকিটুকু আদায়ের পালা।

৪০৩৪ নাম্বার রুমে মক্কেল তাঁর জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো। সে ঢুকতেই মক্কেল ব্যস্ত গলায় প্রশ্ন ছোঁড়ে,'কি খবর আনলেন ?? দেরী করবেন না। বলুন, কী খবর আনলেন, মি.হক ??'
- 'বলছি, বসুন।' শান্ত ভঙ্গীতে জবাব দেয় মোজাম্মেল হক। 'আগেই বলিছিলাম, এ ধরণের কাজ আমি মোটেই পছন্দ করি না। তারপরেও...তারপরেও আপনার স্ত্রীর হুইস্কিতে সায়ানাইড মিশিয়ে দিতে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি,মি.খন্দকার।'

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন