সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

বালকের পরণে ছিলো ডোরাকাটা পায়জামা


একুশের দিনে অন্যান্য কাজ শেষ করে অখন্ড অবসর যাপন করতে বাছাই করলাম একটা যুদ্ধ বিষয়ক ছবি। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয় বিষয়বস্তু হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যার উপর ভিত্তি করে 'সিন্ডলার্স লিস্ট', 'সেভিং প্রাইভেট রায়ান' জাতীয় কালজয়ী সব চলচ্চিত্র। মার্ক হেরমান পরিচালিত 'দ্যা বয় ইন স্ট্রাইপড পায়জামা' হয়তো সমালোচক-দের কাছে ভবিষ্যতে এ জাতীয় ক্লাসিকের মর্যাদা পাবে না, তবে একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে আমার ব্যক্তিগত পছন্দের তালিকায় আমি এ ছবিকে বেশ উপরের দিকেই রাখবো।
দেড় ঘন্টার এ ছবিতে পরিচালক মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন অতি অল্প পরিসরে চরিত্র-গুলোর মানসিকতা ফুটিয়ে তোলায়। ছোট শিশুদের প্লেনের ভঙ্গীতে হাত ছড়িয়ে উড়তে থাকার দৃশ্য দিয়ে ছবিটি শুরু হওয়ার পর থেকে মুহুর্ত মাত্র পর্দা থেকে মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমকালীন এক জার্মান কর্ণেলের আট বছর বয়েসী কল্পণাপ্রবন বালক 'ব্রুনো' হচ্ছে এ ছবির ঘটনা সঞ্চালক। উপরওয়ালা'র নির্দেশে শহর থেকে এক প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কর্নেলের
বাসস্থান পরিবর্তন দিয়ে এ ছবির মূল গল্প শুরু হয় । কর্নেলের নতুন কর্মস্থল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদী নিধন-যজ্ঞের জন্যে হিটলারের সৃষ্ট অসংখ্যা নাজি ক্যাম্পের একটির সন্নিকট, যে নাজি ক্যাম্পগুলোতে বন্দীদের পড়তে হতো ডোরাকাটা পায়জামা। কর্ণেলের দায়িত্ব নাজি ক্যাম্পের উপর বহির্বিশ্বের 'ভুল' ধারনা ভাঙ্গাতে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ, যা পৃথিবীকে জানাবে নাজি ক্যাম্পে ইহুদী-দের আনন্দময় (!!) যুদ্ধ-বন্দীর জীবন।
ভবিষ্যতে 'এক্সপ্লোরার' হতে চাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ব্রুনোর সময় নতুন বাসভবনে হয়ে পড়ে স্থির। তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায় তার ঘরের জানালা দিয়ে দেখা বাড়ি থেকে সামান্য দূরের নাজি ক্যাম্পটি। সেই ক্যাম্পে সবার পরনে ডোরাকাটা পায়জামা। কর্নেল পিতা বোঝান, ওই 'ফার্মে'র সকলেই ওভাবে পোষাক পড়ে। ব্রুনোর ঘরের জানালা বন্ধ করে দেয়া হয়। কিন্তু শিশুর কৌতূহল বেড়েই চলে। 'ডোরাকাটা ফার্মের'-ই একজন কেন মালী হিসেবে কাজ করছে তার বাড়িতে ?? জার্মান সৈনিকদের ভয়ে কেন ভীত থাকে সে সর্বদা?? সত্যিই কি মালী হবার আগে তার পেশা ছিলো ডাক্তারী ?? রহস্যময় ঐ ডোরাকাটা ফার্মের চিমনি থেকে মাঝে মাঝে ভেসে আসে কিসের ধোঁয়া ??
নতুন বাড়িতে আসেন নতুন শিক্ষক। উগ্র জার্মানপন্থী শিক্ষক ব্রুনো ও তার বোনের উপর চাপিয়ে দেন, 'প্রতিটি ইহুদী ভয়ানক' -এই তত্ব। বিস্মিত ব্রুনো-কে শিক্ষক বলেন সে যদি একটি মাত্র ভালো, বিশ্বাসযোগ্য ইহুদী খুঁজে পায়, তবে সেই হবে সবার চে' বড় এক্সপ্লোরার।
জার্মান উগ্রপন্থী শিক্ষার জন্যে হোক অথবা বয়সের দোষেই হোক, দ্বাদশবর্ষীয়া ব্রুনোর বোন আকৃষ্ট হয়ে পড়ে পিতার অধঃস্তন এক নাকঊঁচু জার্মান অফিসারের -যার সাহিত্যের অধ্যাপক বাবা ইহুদীদের প্রতি এই অবিচার জার্মান হয়ে ও সহ্য করতে না পেরে
সুইজারল্যান্ডে নির্বাসন নিয়েছেন। এই অফিসার-ই ব্রুনোর মা'র কাছে ফাঁস করে দেয়, ডোরাকাটা ফার্ম থেকে ভেসে আসা ধোঁয়া জীবন্ত ইহুদী পোড়ানোর-ই সাক্ষ্য।
এই অবসরে ডোরাকাটা ফার্মে পৌঁছবার পথ এক্সপ্লোর করার মাধ্যমে ব্রুনো পরিচিত হয় সমবয়সী ডোরাকাটা পায়জামা পরিহিত ইহুদী বালক 'শ্মুল' এর সাথে। ঘনিষ্ঠতা বাড়ে দুই ভিন্ন জাতিধারার প্রতিনিধিত্ব করা দুই বালকের। একবার ব্রুনোর কারনেই নির্মম শারীরিক নিগ্রহের শিকার হতে হয় শ্মুলকে। তা সত্বে ও দু'জনের বন্ধুত্ব অটুট। দুই সমবয়সী বালক- রাজনৈতিক পরিস্থিতি অগ্রাহ্য করে নিজেদের মত করে দেখতে থাকে অপরকে। দুঃখী শ্মুল একদিন জানায় তার পিতার আকস্মিক নিখোঁজ হবার কথা।
স্ত্রীর সাথে ক্রম-বর্ধমান মতের অমিল থেকে কর্নেল সিদ্ধান্ত নেন, এই বাসভবন থেকে পুনরায় শহরে নিয়ে যাওয়া হবে তার স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দিনে এক্সপ্লোরার ব্রুনো বন্ধু শ্মুল-এর পিতাকে খুজ়েঁ পেতে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিকল্পনা করে বসে। বজ্রসহ মুষলধারে বৃষ্টিপাতের সেই দিনে মঞ্চায়িত হয় ছবির চূড়ান্ত ক্লাইম্যাক্স।
ছবির কিছু কিছু দৃশ্য ছিলো খুব-ই মর্মস্পর্শী। শেষদৃশ্য বাদে আলাদা করে বলতে হয় দুই বালকের মুখোমুখি আলাপচারিতার দৃশ্য-গুলো। কাটাঁতারের বেড়ার দু'পাশ থেকে দুই বালকের খেলা আর অনুভূতি বিনিময় এয়ারটেলের ঐ বিখ্যাত বিজ্ঞাপন দৃশ্যের মতই দেখাচ্ছিলো।
সুঅভিনয়ের জন্যে 'ব্রুনো' চরিত্রে আসা বাটারফিল্ড, 'কর্নেল' চরিত্রে ডেভিড থিলুইস, 'শ্মুল' চরিত্রে জ্যাক স্ক্যানলনের প্রশংসা করতে হয়। বিশেষ করে পারিবারিক জীবন এবং কর্তব্যবোধের টানাপোড়েনের ফুটিয়ে তোলায় ডেভিড এবং ডোরাকাটা পায়জামার বালকের ভূমিকায় জ্যাক ছিলো অনবদ্য। আর ছবির শেষ আধঘণ্টা আমাকে প্রায়-ই মনে করিয়ে দিয়েছে রবার্তো বেনিনি'র অস্কারজয়ী মাস্টারপিস 'লাইফ ইজ বিউটিফুল' ছবির কথা।
কাজেই একটু আবেগধর্মী ছবি যাদের পছন্দ, তারা অনায়াসে দেখতে পারেন 'ডোরাকাটা পায়জামার বালকে'-র গল্প। হতাশ হতে হবে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন