রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

মতি নন্দীর সাথে আড়াই দিন

০১।

কথাটা মনে হয় প্রমথ চৌধুরীই বলেছিলেন। "টাউন হলের বক্তৃতা শুনতে যে পরিমাণ লোক জমা হয়; তার চেয়ে ঢের বেশী লোক জমা হয় গড়ের মাঠের খেলা দেখতে। অথচ,এ কথা সবাই জানে যে টাউন হলের বক্তৃতার উদ্দেশ্য অতি মহৎ, আর গড়ের মাঠের খেলার উদ্দেশ্য নিছকই বিনোদন।" প্রচন্ড রকম সত্যি কথা।অর্থহীন খেলাধূলার যে নির্মল আনন্দ,তা আর কিছুতেই মানুষ পায় না। আমি মনে করি এই আনন্দের সাথে তুলনা হতে পারে কেবল বইপড়ার অসামান্য আনন্দের। নিছক বিনোদনের জন্যেই খেলা আর অনুভূতির প্রকাশের জন্যেই সাহিত্য। কাজেই খেলা আর সাহিত্যের সম্মিলন ঘটলে তা যে খুব স্বাদু কিছু হতে বাধ্য- এ ধারণা আমার বুঝতে শেখার বয়সের পর থেকেই।

সাহিত্য আর খেলাধূলা নিয়ে একত্রে ভালো বই দেখেছি খুব কমই।সেই আদ্যিকালের নেভিল কার্ডাস,জ্যাক ফিংগল্টন-এর টুকটাক কিছু পড়ার ভাগ্য হয়েছে। পশ্চিম-বাংলার শঙ্করীপ্রসাদ বসুর আমি বড় একজন ভক্ত। হালে আমাদের রণজিত বিশ্বাস আর উত্পল শুভ্র ও খেলা নিয়ে লিখছেন। তারপরেও 'আনন্দবাজার'পত্রিকার সাংবাদিক মতি নন্দীকে নিয়ে কেন ক্রীড়াসাহিত্যিকদের এতো মাতামাতি তা জানবার ইচ্ছে ছিলো। উত্তর পেলাম মতি নন্দীর 'দশটি কিশোর উপন্যাস' সংকলন থেকে। দুর্দান্ত এই সংকলন টানা পড়ে শেষ করলাম মোটামুটি ষাট ঘণ্টার মাঝে।

০২।

সংকলন পড়ে যা বুঝলাম তা হলো কিশোরদের পাঠের উপযোগী বলেই এগুলোকে ঠিক কিশোর উপন্যাস বলা যাবে না। মতি নন্দীর কুশলী কলমে তাঁর রচনে কেবল কিশোরদের থাকেনি; হয়ে গেছে খেলা বোঝেন- খেলা ভালোবাসেন এমন সব মানুষের। [কিশোর উপন্যাসে যাদের অরুচি,তাদের বলি- সেদিন আজিজ মার্কেটে মতি নন্দীর 'দশটি উপন্যাস' নামের আরো একটি সংকলন চোখে পড়েছে। আগ্রহীরা খোঁজ নিতে পারেন। ] মতি নন্দীর গল্প ছিলো আমাদের সকলের পরিচিত গল্পগুলোই। যে গল্পে খেলোয়াড়ের প্রতিপক্ষ কেবল বিরোধী দলেই নয়; প্রতিপক্ষ ছড়িয়ে আছে তাঁর পরিবার,পাড়া-প্রতিবেশী,অর্থের লোভ আর খেলাধূলার নোংরা রাজনীতির মাঝে।

ভদ্রলোকের লেখায় সবচেয়ে বেশী ধরা পড়েছে তাঁর বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য। প্রতিটি লেখাই ক্রীড়াসাহিত্যের একেকটি অবশ্যপাঠ্য হলেও এখানে কেবল ভালোলাগা দুটো উপন্যাসের বর্ণনাই দেই। খুব,খুব বেশী ভালো লেগেছে 'অপরাজিত আনন্দ' এবং 'নারান' উপন্যাস দুইটি।

দুরন্ত,ছটফটে এক কিশোরের গল্প হলো 'অপরাজিত আনন্দ'। ভারতের এন্ডি রবার্টস হবার মত মেধা নিজের মাঝে আবিষ্কার করেও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে তার দিন কাটে কেবল বিছানায় শুয়ে,জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। সে জীবনে তার একমাত্র আনন্দ রেডিওর ধারাভাষ্য। তপ্ত জ্বরে পুড়তে থেকেও আনন্দ ব্যানার্জী নামের কিশোর স্বপ্ন দেখে উইম্বল্ডন ফাইনালে সে খেলছে জিমি কোর্নসের সাথে অথবা ইডেন গার্ডেনে তার ইয়র্কার উড়িয়ে দিচ্ছে ক্লাইভ লয়েডের। আনন্দের ওইটুকু বিছানায় কত্ত খেলা !!!

'নারান' উপন্যাসের গল্প হলো হার না মানার। সংবাদপত্রের তৃতীয় শ্রেণীর এক কর্মচারী আবিষ্কার করে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০০০ মিটার, ১০০০০ মিটার এবং ম্যারাথন ইভেন্টে স্বর্ণপদক বিজয়ী এমিল জ্যাটোপেক আর তার জন্ম একইদিনে,জ্যাটোপেক তার দু'বছরের বড়। এরপর নারানের আইকন হয়ে ওঠেন এমিল জ্যাটোপেক আর তাঁর সাথে পদে পদে নিজের মিল খুঁজে পায় সে । ভারতবর্ষ ভ্রমণে আসা জ্যাটোপেক দম্পতির সাথে দেখা করতে আগ্রহী নারান লাভ করে জীবনের পরম সত্য।

০৩।

মতি নন্দী সম্পর্কে উইকি ঘেঁটে ও তেমন কিছু পাওয়া গেলো না। বইপত্র নেড়েচেড়ে যা পেলাম- ভদ্রলোক 'আনন্দবাজার'পত্রিকার ক্রীড়া সাংবাদিক ছিলেন,ক্রিকেটের রেকর্ডসের উপর বই লিখেছেন কিছু। খেলা বিষয়ক উপন্যাসও কম লেখেননি, ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তাঁর বহু বই অনূদিত হয়েছে। পেয়েছেন 'আনন্দ' পুরষ্কার। 'সাদা খাম' উপন্যাস তাঁকে ১৯৯১ সালে এনে দিয়েছে সাহিত্য আকাদেমী পুরষ্কার।

গুণী এই লেখক সম্পর্কে কোন কিছু জানলে তা অনুগ্রহ করে আমাদের সাথে ভাগ করে নেবেন।

মতি নন্দীর কলম আরো খেলুক-আরো খুলুক,এই কামনায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন