সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

ক-নগরে একজন অপরিচিত লোক এসেছিলো...

আমাদের ক-নগরে একজন অপরিচিত লোক এসেছিলো। সময়টা ছিলো ঠিক মধ্যদুপুর। নগর তোরণে পাহারারত রক্ষীদের পাহারা এড়িয়ে অপরিচিত লোকটি কীভাবে অনায়াসে নগরে প্রবেশ করেছিলো, তা আমাদের জানা নেই। ক-নগরের লোকেরা এখন বলে, যেহেতু সে মধ্যদুপুরে এসেছিলো- এবং সময়টা মাঝদুপুর ছিলো বলেই হয়তো- স্বৈরশাসক জেনারেল বাতিস্তার নিযুক্ত নগর তোরণের প্রহরীরা পালাবদল করছিলো। এমন নিখুঁত সময়কাল বেছে নেওয়া লোকটির দূরদর্শীতার একান্ত লক্ষণ বলে গন্য হতে পারে, কিন্তু সন্দেহ নেই, একাজে তাঁর ভাগ্যেরও প্রয়োজন ছিলো। সেই ভাগ্য লোকটির সাথেই ছিলো। যেমন ছিলো লোকটির পরনের আকাশী নীল ঢোলা জামা আর সাদা পাতলুন।

আমাদের ক-নগরে একজন অপরিচিত লোক এসেছিলো এবং সে নগরে প্রবেশ করেছিলো বিনা বাধায়। ক-নগরের অলিতে গলিতে এলোমেলো হাঁটবার সময় লোকটি হয়তো নির্দিষ্ট কোন পথ অনুসরণ করেনি। কিন্তু তবুও সে এসে পৌঁছেছিলো চৌরাস্তার মোড়ে রিশানের চায়ের দোকানে, যেটা নামে চায়ের দোকান হলেও চরিত্রে এবং বিশালত্বে আদতে একটি রেঁস্তোরা। নগর তোরণের মত এই দোকানে কোন রক্ষী থাকে না, তাই ক-নগরবাসী এখানে ভীড় করে,আড্ডা দেয়,সামাজিক কুশল বিনিময় করে। রিশানের চায়ের দোকানে তাই সব ধরণের মানুষ আসে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলের দল আসে,অফিসফেরত কেরানী আসে,ব্যর্থ বিপ্লবে চিরতরে পা হারানো খোঁড়া বিপ্লবী আসে- এসেছিলো ক-নগরে সদ্য প্রবেশ করা অপরিচিত লোকটিও। রেঁস্তোরায় গমগমে দশা দেখে লোকটা গিয়ে বসেছিলো নিয়মিত খদ্দেরদের টেবিলে,যেটায় সেদিন কোন কারণে একটা চেয়ার ফাঁকা ছিলো।রেঁস্তোরা-মালিক রিশান তাঁর রীতি অনুযায়ী খানিকপর এসেছিলো অপরিচিত এই খদ্দেরের কাছে, যে খদ্দের তাঁর কাছে চেয়েছিলো পেস্তার শরবত। পেস্তার শরবতে লোকটা চুমুক দিচ্ছিলো আর ক-নগরের লোকেরা এই নতুন লোকটিকে দেখছিলো সতর্কতার সাথে,আড়চোখে,লোকটার নজর এড়িয়ে।

আমাদের ক-নগরে একজন অপরিচিত লোক এসেছিলো এবং সে রিশানের দোকানে পেস্তার শরবতে চুমুক দিতে দিতে শুনছিলো অন্যেরা কী বলে। ক-নগরের লোকেরা নানা বিষয়ে কথা বলে। তাঁরা বাজারে চিনির ক্রমশঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত মূল্য নিয়ে কথা বলে, টিভি নাটকে দেখা চর্বি সর্বস্ব নায়িকারে নিয়ে কথা বলে, রিশানের ছোটছেলের চাকরিপ্রাপ্তি নিয়ে কথা বলে। এইসব কথাবার্তা শুনতে শুনতে ক-নগরে আসা অপরিচিত লোকটারও বোধহয় কথা বলতে ইচ্ছা হয় এবং পেস্তার শরবতে চুমুক দেয়া থামিয়ে সে হঠাৎ গলা বাড়িয়ে প্রশ্ন করে,"আচ্ছা ভাই, তোমাদের দেশের সবচেয়ে সবুজ বাগানটা কোথায় আছে- আমায় বলতে পারো ?"

আমাদের ক-নগরে একজন অপরিচিত লোক এসেছিলো এবং সে আমাদের কাছে জানতে চায়, ক-নগরের সবচেয়ে সবুজ বাগানটা কোথায়। আমরা এ প্রশ্নে অবাক হই আর হতচকিত আলকাজার চাচা লোকটাকে জানায় যে সবচেয়ে সুন্দর বাগানটা জেনারেল বাতিস্তার বাড়ির ভেতরে- সেখানে কারো প্রবেশ নিষেধ। অপরিচিত লোকটা একটু ভাবে এবং তারপর জানতে চায় ক-নগরের সবচেয়ে স্বচ্ছ পানির ঝরনাটা কোথায় অবস্থিত। লোকটার এইসব অবান্তর প্রশ্নে ক-নগরের লোকেরা বিরক্ত হয় কিন্ত তবুও প্রাক্তন নাবিক ইভানভ বলে যে সবচেয়ে স্বচ্ছ পানির ঝরনাটাও জেনারেল বাতিস্তার বাড়ির ভেতরে-সেটার পানি কেবল সে ব্যবহার করে,নগরবাসী জেনারেলের লোকেদের দ্বারা সরবরাহকৃত পানি খায়। লোকটা এবার অবাক হয়ে জানতে চায়, জেনারেল বাতিস্তা আমাদের দেশের রাজা কি না; আর সেই টেবিলের ক-নগরের লোকেরা মাথা নেড়ে জানায়, হ্যাঁ- জেনারেল এদেশের রাজা। এই জবাবে লোকটা কেমন বিভ্রান্ত হয়ে যায়। আনমনেই খানিক নিজের এলোমেলো চুল সোজা করার ব্যর্থ চেষ্টা করে নিজেকেই যেন বলে, সবচেয়ে সবুজ বাগান আর সবচেয়ে স্বচ্ছ ঝরণা কেনো কেবল দেশের রাজার দখলে থাকবে ?? এ কেমন রাজা ?? অপরিচিত লোকটার এই প্রশ্নে আমাদের মাঝে আশ্চর্যজনক এক ধরণের নীরবতা দেখা দেয়। কেউ রিশানকে আরেক গ্লাস শরবত দেয়ার জন্যে ডাকাডাকি করে, কেউ আজকের দিনটা কতটা গরম এইসব হাবিজাবি কথা শুরু করে আর ব্যর্থ বিপ্লবে পা হারানো বিপ্লবী দ্রুত রেঁস্তোরা ইত্যাগ করে। কিন্তু হঠাৎ-ই আমাদের নির্লজ্জ নীরবতা ভেঙ্গে বুড়ো পেদ্রোর ছয় বছর বয়স্ক নাতি তিমুর চ্যাঁচিয়ে ওঠে, "জেনারেল বাতিস্তা খারাপ লোক ! খুব খারাপ !!"

আমাদের ক-নগরে একজন অপরিচিত লোক এসেছিলো এবং তাঁর প্রশ্নের প্রেক্ষিতেই তিমুর নামের ছেলেটি তাকে জানিয়েছিলো জেনারেল বাতিস্তা জনপ্রিয় নন। বুড়ো পেদ্রো দ্রুত নাতির মুখ চেপে ধরতে চাইলেও তখন দেরী হয়ে গিয়েছিলো। কোণের একটা টেবিল থেকে শহর জুড়ে জেনারেলের নিযুক্ত করা অসংখ্য সাদা পোশাকের গুপ্তচরদের একজন তার পরিচয়পত্র এক হাতে তুলে ধরে অপরহাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে সেই টেবিলের দিকে এগিয়ে আসে, যে টেবিলে ছিলো অপরিচিত লোকটি। গুপ্তচর খুঁজে বের করার চেষ্টা করে জেনারেলের প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্যটি কে উচ্চারণ করেছে। ক-নগরের লোকেরা এখন বলে, হয়তো কন্ঠের তারল্য বিবেচনা করে অথবা হয়তো বুড়ো পেদ্রোর নাতির মুখ চেপে ধরার ব্যর্থ প্রচেষ্টা থেকে গুপ্তচরটি কারো সাহায্য ছাড়াই তিমুরকে চিহ্নিত করে তাকে গুলি করতে সমর্থ হয়। বিন্দুমাত্র শব্দ না করে তিমুরকে মারা পড়তে হয়- কারণ যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনরুপ ক্ষোভ প্রকাশ করা এই দেশে মৃত্যুদন্ডযোগ্য অপরাধ- সেহেতু তিমুরের না মরে আর উপায় থাকে না। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যে হুমকি স্বরুপ আরেকজন অপরাধীকে এভাবে মেরে ফেলার পরেও গুপ্তচরটির মাঝে কোন ভাবান্তর দেখা যায় না। পিঠ ফিরিয়ে নির্বিঘ্নে সে রেঁস্তোরার দরজার দিকে এগোয়। আমাদের নীরব দৃষ্টির সামনে আরেকটি অভিনব ঘটনা ঘটে। এক অভূতপূর্ব ক্রোধে সদ্য শহরে আসা লোকটি ঝাঁপিয়ে পড়ে গুপ্তচরটির পিঠে। খানিক হাতাহাতির পরে রেঁস্তোরার উপস্থিত ক-নগরের লোকেরা দেখে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র হাতে অজ্ঞাত পরিচয়ের লোকটির সামনে গুপ্তচরটির মৃতদেহ পড়ে আছে। ক-নগরের লোকেরা এখন বলে, অজ্ঞাতনামা লোকটি এরপর বলেছিলো যে, অস্ত্র হাতে থাকলেই দুর্জনেরে ভয় পাওয়া ঠিক না- কিংবা এইসব আরো হাবিজাবি ঈশপের গল্প। কিন্তু এ কথা সত্য, এইসব হাবিজাবি ঈশপের মন্ত্র কেমন ভাবে যেন সেদিন কাজ করেছিলো ক-নগরের লোকেদের উপর,কে জানে, হয়তো অজ্ঞাতনামা লোকটি ঈশপ স্বয়ং ছিলো।

এরপর কী ঘটেছিলো, তা স্পষ্ট করে এখন ক-নগরের লোকেরা বলতে পারে না। তবে এটা নিশ্চিত যে নগর জুড়ে সাদা পোশাকের গুপ্তচর,নগর তোরণের রক্ষীদল,জেনারেল বাতিস্তার বাসভবনের প্রহরীরা এবং জেনারেল বাতিস্তা স্বয়ং বিপ্লবে নিহত হয়েছিলো। দ্বি-প্রাহরিক ভোজনের পর এরকম অতর্কিত হামলার জন্যে কেউই প্রস্তুত ছিলো না; আর তাই বিকেলের মাঝেই শহর সম্পূর্ণ জনতার দখলে চলে আসে। সেই সন্ধ্যায় প্রাক্তন রাজার প্রাসাদে -যেখানে সবুজতম বাগান আর স্বচ্ছতম ঝরণা আছে-সেখানে চমৎকার একটা অনুষ্ঠান হয়। অজ্ঞাত পরিচয়ের সেই লোকটিকে অনুষ্ঠানের মধ্যমণি করে আমরা প্রাণ খুলে হাসি, উচ্চস্বরে চিৎকার করি, সুন্দরী মেয়েদের উদ্দেশ্যে চোখ টিপ দেই... স্বজনহারারা কাঁদে।

কিন্তু ক-নগরের নগর তোরণে পরদিন সকালে আরো দুইজন নতুন মুখ দেখা যায়। তারা এসেছে পাশের রাজ্য অরিন্দমপুর থেকে আর তাদের পরণে সাদা পোশাক। আমাদের বিপ্লবের সূচনাকারী অজ্ঞাতনামা লোকটার ছবি দেখিয়ে এই দুইজন জানায়- ইলেন দ্রুমাস নামের এই মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি গতকাল অরিন্দমপুরের মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছে। সাদা পোশাকের এই দুই নবাগত আমাদের কাছে জানতে চায়, ক-নগরে এই লোকটি এসেছে কি না- যেহেতু তারা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। ...

ক-নগরের লোকেরা এখন কেবল জানে যে এই শহরে একজন অপরিচিত লোক এসেছিলো। তাঁর নাম ছিলো ইলেন দ্রুমাস- যে একজন ভুল লোক হয়ে একটি সঠিক কাজের সূচনা করেছিলো...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন