বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

উজাইনা এবং দেবদূত

লালচে মাটির পর্বতচূড়ার ঠিক পেছনেই ক-নগরের প্রায় চারলক্ষ নাগরিকের আবাস। দলপতি উজাইনা আনমনে তাকিয়ে নীচের ক-নগরের শেষ বিকেলের কর্মব্যস্ততা প্রত্যক্ষ করেন। দলপতি উজাইনা আজকাল প্রায় সন্ধ্যা এই পর্বতচূড়ায় কাটান। সন্ধ্যার ঝিরঝিরে বাতাসে সামনের দিগন্তে সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখতে তাঁর বড় ভালো লাগে। অস্তায়মান সূর্যের দিকে তাকিয়ে সাথে আনা দারুচিনির টুকরো চিবোতে চিবোতে জীবনকে আজকাল তাঁর বড় অর্থময় বলে মনে হয়।


আজকেও সূর্যাস্তের ঠিক পূর্ব-মুহুর্তে উজাইনা যখন তাঁর দারুচিনির শেষখন্ডটি মুখে দিলেন-ঠিক তখনই ঘটনাটি ঘটলো। তিনি দেবদূতকে দেখতে পেলেন।

প্রাচীন পুঁথিতে তিনি অসংখ্যবার এই দেবদূতের বর্ণনা পড়েছেন; তাই দেবদূতকে চিনে উঠতে তাঁর বিন্দুমাত্র বেগ পেতে হলো না। কী অপূর্ব দৈহিক রুপ !! অদ্ভূত এক পবিত্রতায় ছেয়ে আছে দেবদূতের মুখটি। চোখদুটো তাঁর আশ্চর্য মায়াবী। সে সাথে দেবদূতের মুখে বিজাতীয় ভাষার এক অদ্ভূত গান - 'হাপ্পা হাপ্পা'। দলপতি উজাইনা অবাক চোখে ঈশ্বরের এই অসামান্য সৃষ্টির দিকে চেয়ে রইলেন।

পেছনে পায়ের শব্দে উজাইনা ফিরে তাকালেন। পৌরসভার প্রধাণ আনায়াসকে আসতে দেখা যায়,তাঁর মুখে উদ্বেগ। ব্যস্ত গলায় আনায়াস বলেন," মহামতি উজাইনা, ঠিক এই মুহুর্তেই আপনাকে আমাদের প্রয়োজন। দক্ষিণ প্রদেশের গোলযোগ বিষয়ক গুরুত্বপুর্ন সভাটি কেবল আপনার অভাবেই শুরু হতে পারছে না। "

আনায়াসের বর্ণনায় কর্ণপাত না করে বৃদ্ধ উজাইনা হাত নির্দেশ করেন সামনের দিকে। তাঁর কণ্ঠ উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে,"থামো আনায়াসা, থামো। দেখো- ঈশ্বর আরেকবার আমাদের অনুগ্রহ করেছেন। "

পৌরসভার প্রধাণ আনায়াস বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ওঠেন, " ও মহামান্য উজাইনা ! এটি কী ??"

-"মূর্খ ! প্রাচীন পুঁথির অষ্টাদশ শ্লোক পড়নি ??"

-"অষ্টাদশ শ্লোক ?? যেটি মহামান্য ক্রোনাসের সময় রচিত হয়েছিলো ??"

-"হ্যাঁ আনায়াস,হ্যাঁ। আজ হতে সাতচল্লিশ চাঁদ পূর্বে আমাদের উর্ধ্বতন দ্বাদশ পুরুষ মহামতি ক্রোনাস দেবদূতকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এই দেবদূতই তাঁকে দিয়েছিলো প্রথম মৌলিক সংখ্যার ধারণা, এই দেবদূতই তাঁকে প্রথম শিখিয়েছিলেন বন্ধুত্ব কারে বলে। মহামতি ক্রোনাস তাঁর স্মৃতিকথায় এই দেবদূতের কথা অত্যন্ত ভক্তিসহ লিখে গেছেন। তাঁর স্থির বিশ্বাস ছিলো এই দেবদূত আবার আসবেন।
আমাদের দীর্ঘদিনের প্রার্থনা ঈশ্বর শুনেছেন আনায়াস, দেবদূত আবার এসেছেন। যাও আনায়াস, যাও। সকলকে জানাও, আর বিলম্ব করো না।"

দলপতি উজাইনার আদেশে হতবিহবল আনায়াস স্থান ত্যাগ করেন। বৃদ্ধ উজাইনা উত্তেজনা সংবরণ করতে পারেন না। আনায়াসের ফিরে আসার অপেক্ষা না করেই তিনি পর্বতের ঢাল বেয়ে যত দ্রুত সম্ভব দৌড়ে নামতে থাকেন। মুখে চেঁচিয়ে তিনি ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকেন। তাঁর এই কাজ দেবদূতের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়। দেবদূত তাঁর আশ্চর্য মায়াবী দু'চোখ মেলে উজাইনার দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন; তাঁর মুখের সেই বেসুরো 'হাপ্পা' 'হাপ্পা' গানে মুখরিত হতে থাকে চারপাশ।আশ্চর্য সতেজ সেই দেবদূত তাঁর হাত প্রসারিত করেন উনাইজার দিকে। আর তারপর, ...

তারপর সব অন্ধকার।

*******************************************

তন্দ্রা ভেঙ্গে পরিচারিকাটি ধড়ফড় করে এদিক-ওদিক তাকায়। বাগানের পিপঁড়া ঢিঁবির পাশে ছোট্ট তাতাইকে হামাগুড়ি দিতে দেখে সে ছুটে গিয়ে দ্রুত হাতে তাতাইয়ের হাত-মুখ পরীক্ষা করে। হতাশ স্বরে বলে,"তাতাই, তুমি আবার পিঁফড়া মাইরা খাইতাছো ??..."

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন